বার্তা সংস্থা আবনা : ‘মোদি ঝড়ে’ উড়ে গেল কংগ্রেস। টানা ১০ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার নতুন ইতিহাস লিখল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)’। ত্রিশ বছরে এই প্রথম নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভারত শাসনের ভার নিতে যাচ্ছে কোনো জোট। আর ভারতবাসীর এ উপহার পেয়ে ‘নতুন যুগের সূচনা’র ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি।
লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৩৩৭টিতেই জয় পেয়েছে এনডিএ। এর মধ্যে বিজেপি একাই জিতেছে ২৮৩ আসনে। দিল্লির মসনদ তাই এখন রয়েছে গুজরাটের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অপেক্ষায়। সব কিছু ঠিক থাকলে ২১ মে তাতে পা রাখবেন তিনি। তার মন্ত্রিসভাও প্রায় চূড়ান্ত। বাকিটুকু সারতে দলের সংসদীয় বোর্ড সদস্য ও শরিকদের নিয়ে বসছেন আজই।
কে জানত এমন ভয়াবহ পরাজয় অপেক্ষা করছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার (ইউপিএ) জন্য! মাত্র ৫৯ আসনে জয়ের মুখ দেখেছে তারা। এর মধ্যে সোনিয়া গান্ধীর শিকেয় সবে ৪৪টি। এমন হারও যে আগে কখনও দেখেনি ভারত।
এবারের নির্বাচনে আরেক বড় বিস্ময় জয়ললিতা। তামিলনাড়ুর অন্য সব দল এমনকি কংগ্রেসকেও দৃশ্যপট থেকে দূরে সরিয়ে রাজ্যের ৩৯ আসনের ৩৭টির দখল নিয়েছেন তিনি। আসন সংখ্যার বিচারে ললিতার দল এআইএডিএম এখন তাই ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি।
আবারও তৃণমূল ঝলক দেখল ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ। এ রাজ্যের ৪২ আসনের ৩৪টিই পেয়েছে তারা। আর কংগ্রেসের মতোই ভয়াবহ দুর্দিন বামদের। মাত্র ১২টি আসন আঁকড়ে রাখতে পেরেছে তারা। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টির প্রথম লোকসভা নির্বাচন খুব বেশি সুখের হয়নি। দুই আসনেই মোদির কাছে হেরেছেন পার্টি প্রধান কেজরিওয়াল। মাত্র চার আসনে জয় পেয়েই এবারের মতো সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে দলটিকে। বাকি ৬০ আসন বিভিন্ন দলের।
বিজেপির জোটসঙ্গী ‘কট্টর হিন্দুত্ববাদী’ রাজনৈতিক সংগঠন শিব সেনা পেয়েছে ১৯ আসন, আরেক জোটসঙ্গী অন্ধ্র প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি পেয়েছে ১৬ আসন। আর ইউপিএ জোটের শরিকদের মধ্যে এনসিপি পেয়েছে মাত্র ৫টি ও আরজেডি পেয়েছে ৪টি আসন।
আগের (২০০৯) লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে এবার ১৭৫টি আসন হারিয়েছে ইউপিএ। আর দল হিসেবে কংগ্রেস হারিয়েছে ১৬২টি। বিপরীতে আগেরবারের চেয়ে ১৯৬টি আসন বেশি পেয়েছে এনডিএ। দল হিসেবে বিজেপির শিকেয় যোগ হয়েছে ১৬৭টি আসন। জয় ললিতার দল গতবারের চেয়ে ২৮টি আর তৃণমূল বেশি পেয়েছে ১৫ আসন। আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টি (২২ এর স্থলে ৫) ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি (২১ থেকে ০), বিহারের নীতিশ কুমারের জনতা দল (১৮ থেকে ০) ও তামিলনাড়–র ডিএমকের (১৮ থেকে ০) জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে।
ও হ্যাঁ, প্রথমবার দাঁড়িয়েই এবার জিতেছেন ৩১ প্রার্থী। এর মধ্যে চার নারীও রয়েছেন। তামিলনাড়–তে সর্বাধিক না ভোট পড়েছে- সংখ্যায় তা ৫ লাখ ৬৮ হাজার। শতকরা হিসাবে এটি প্রদত্ত ভোটের প্রায় দেড় শতাংশ। ২৪ বিজেপি নেতা জিতেছেন ১ লাখের বেশি ভোটে। বিজেপির প্রভাবশালী নেতারা ‘সবাই’-ই জয়ের মুখ দেখেছেন। শুধু কপাল পুড়েছে অরুণ জেটলির। সোনিয়া ও রাহুলসহ প্রভাবশালীরা উতরে যেতে পারলেও কংগ্রেসের ভরাডুবিতে ডুবেছেন দুই ক্রিকেটার আজহার উদ্দিন ও মোহাম্মদ কাইফ। ফুটবলার বাইচুং ভুটিয়া তৃণমূলের টিকিটে জিতেছেন। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য চমক দেখিয়েছেন চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত তারকারা। সন্ধ্যা রায়, মুনমুন সেন, শতাব্দী রায়, বাবুল সুপ্রিয়, দেব এদের অন্যতম।
নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে স্বভাবতই খুশি বিজেপি। দুপুর না গড়াতেই টুইটারে মোদি লিখেন ‘ভারত জিতেছে। এই জয় ভারতের। শুভদিন আসছে।’ সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে ভারতবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। সেই সঙ্গে ভারতবাসীকে দেয়া অঙ্গীকার পূরণের প্রতিশ্র“তি পুনর্ব্যক্ত করেন। বলেন, ‘সরকার হবে সাধারণের জন্য। দেশের জন্য আমি মরতে নয়, বাঁচতে চাই।’ এর আগে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিজেপি প্রধান রাজনাথ সিং ঘোষণা করেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠাই বিজেপির লক্ষ্য। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, এজন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এবার ‘অন্ধকার দূর হবে, সূর্যোদয় হবে এবং আলো খেলা করবে।’
বিজয়ে অভিনন্দনে ভাসছেন নরেন্দ্র মোদি, তার দল ও শরিকরা। কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, আম আদমি নেতা কেজরিওয়ালসহ অধিকাংশ নেতারাই মোদিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও অভিনন্দন জানিয়েছেন তাকে। বিশ্ব নেতাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফসহ অনেকেই তাকে অভিনন্দন জানান। বিপরীতে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের প্রধান লালু প্রাসাদ যাদব বলেছেন, ‘মোদিকে অভিনন্দন নয়।’
এনডিএর বিজয়ে ভারতজুড়ে সমর্থকদের মধ্যে বইছে আনন্দের বন্যা। বিজয় মিছিল আর মিষ্টিতে মধুময় বিভিন্ন স্থান। বিপরীতে বিমর্ষ কংগ্রেস শিবির। তবে পরাজয় মেনে নিয়েছে তারা। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। বিজয়ের জন্য বিজেপিকে অভিনন্দন। বিরোধী দল হিসেবে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সবই করবে কংগ্রেস।’ দলের অন্য নেতারা নিজেদের ভুলভ্রান্তি খুঁজে তা শুধরে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। পরাজয়ের দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন রাহুল গান্ধী। তবে দলের নেতারা মনে করেন, এর দায় শুধু তার একার নয়।
জয়ললিতার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এখন ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দায় অনুযায়ী কাজ করে যাব আমরা।’ তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির কণ্ঠ যেন আরও উচ্চকিত। তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচনে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছেন মানুষ। যে অপপ্রচার, কুৎসা রটনা করা হয়েছিল এ রায় তার বিরুদ্ধে মানুষের জবাব।’
ভারতে বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি, অর্থনীতির ধীর গতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সুস্পষ্ট হতাশা থেকেই নির্বাচনে ফলাফলের মোড় ঘুরে গেছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নকেই ইস্যু করে মোদির প্রচারণা কাজে দিয়েছে। ভবিষ্যতে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গুজরাটে শিল্পায়নের দৃষ্টান্ত টেনে তরুণ ভারতীয়দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। গুজরাট উন্নয়নের মডেলকে সামনে রেখে আঞ্চলিক রাজনীতির পরিসর থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের টপকে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে স্থান পান। ‘আগ্রাসী নেতৃত্বগুণে’ নিজের বিরুদ্ধে ২০০২ সালের গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগ ঢেকে জাত-পাত ও ধর্মীয় রাজনীতিতে বিভক্ত ভারতের সমর্থন আদায় করে নেন এ কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা।
১৬তম লোকসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ছিল শুক্রবার। স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় ভোট গণনা শুরু হয়। সারা দেশে একযোগে মোট ৯৮৯টি সেন্টারে এ ভোট গণনা হয়। গণনা শেষ হতে সন্ধ্যা পেরোলেও দুপুর হতে না হতেই স্পষ্ট হয়ে যায় ভারতের নতুন ইতিহাসের রূপরেখা।
৭ এপ্রিল থেকে শুরু করে ১২ মে পর্যন্ত ৯ দফায় দেশের ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দিয়েছেন। এ নির্বাচনে অংশ নেন ৮ হাজার ২৫১ প্রার্থী। প্রায় ১২৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে ৮১ কোটি ৪৫ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন প্রায় ৫৫ কোটি।
ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯৮৪ সালে কংগ্রেস জোট ৫৩৩ আসনের মধ্যে ৪১৪টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে কেন্দ্রে। এরপর দিল্লিতে প্রতিটি সরকার গঠিত হয়েছে আঞ্চলিক ও জাতপাতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দলের সমর্থনে, যাদের মধ্যে সমঝোতার অভাবে কয়েকটি সরকার মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই ভেঙে যায়।
‘সাব কা সাথ, সাব কা বিকাশ’ (সবার সঙ্গে, সবার সমৃদ্ধি) স্লোগান দিয়ে অভূতপূর্ব এ জয় পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। সবার উন্নয়ন করে অর্থনীতির ‘অবতার’ কি হতে পারবেন এককালের এ ‘চা-বিক্রেতা’।#
(রিপোর্ট : দৈনিক যুগান্তর)
১৭ মে ২০১৪ - ১৮:২০
News ID: 609313
টানা ১০ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার নতুন ইতিহাস লিখল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ)’।